রাত ১১:০০, শনিবার, ২৩শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫’ অনুযায়ী, অবৈতনিক শিক্ষার আইনি নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক তালিকায় চরম বিপর্যয়কর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। দেশে মাত্র পাঁচ বছর অর্থাৎ পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার আইনগত নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন এবং বৈশ্বিক সূচকেও তলানিতে। যেখানে একই অঞ্চলের ও সমপর্যায়ের অর্থনৈতিক প্রতিবেশী দেশগুলো দীর্ঘ মেয়াদে অবৈতনিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ রয়েছে অনেক পিছিয়ে।

গবেষকদের মতে, এই সংকটের কারণগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে স্পষ্ট হলেও তা সমাধানে যুগান্তকারী রাজনৈতিক সদিচ্ছার তীব্র অভাব রয়েছে।

বিশ্বমঞ্চে ও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ

ইউনেস্কো ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকস এবং এডুকেশন ডাটা অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স কমিশনের যৌথ প্রতিবেদনে প্রতিটি দেশের ‘ইয়ার্স অফ গ্যারান্টিড এডুকেশন প্রোগ্রাম’ (ওয়াইজিইপি) বা সরকার আইনত কত বছর অবৈতনিক শিক্ষা দিতে বাধ্য, তা পরিমাপ করা হয়েছে।

এই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পশ্চিম আফ্রিকার টোগো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের মতো দেশের সাথে সর্বনিম্ন স্তরে। অন্যদিকে, শীর্ষস্থানে থাকা অস্ট্রেলিয়া, মরিশাস, সান মারিনো এবং লিচেনস্টাইন ১৩ বছরের অবৈতনিক শিক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়া: অবৈতনিক শিক্ষার মেয়াদকাল (এক নজরে)

দেশঅবৈতনিক শিক্ষার সময়সীমাশিক্ষাক্রমের স্তর
শ্রীলঙ্কা১৩ বছরমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত
পাকিস্তান১২ বছরমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত
আফগানিস্তান১২ বছরমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত
মালদ্বীপ১২ বছরমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত
নেপাল১২ বছরমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত
ভুটান১১ বছরমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত
ভারত৮ বছরঅষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত
বাংলাদেশ৫ বছরপঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত

উৎস: ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া বাকি সব দেশেই মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এমনকি ভারতও বাংলাদেশের চেয়ে ৩ বছর বেশি সুবিধা দিচ্ছে।

কাগজের শিক্ষানীতি: ১৫ বছরেও বাস্তবায়নহীন ‘অষ্টম শ্রেণি’

এই সমস্যাটি নতুন নয়। ২০১০ সালে পাস হওয়া বাংলাদেশের ‘জাতীয় শিক্ষানীতিতে’ বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণি থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত করার স্পষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পরিকল্পনা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ সরকারের এই স্থবিরতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন:

“সরকারের কাছে শিক্ষা কখনোই প্রকৃত অগ্রাধিকার পায়নি। তারা কেবল আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা থেকে কাজ করে, সঠিক বাস্তবায়নের সদিচ্ছা থেকে নয়।”

তিনি উল্লেখ করেন, বাধ্যতামূলক শিক্ষার মেয়াদ বাড়ানো কেবল কোনো প্রশাসনিক আদেশ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক আর্থিক বরাদ্দ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, ভৌত অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলেই এই ধরনের সম্প্রসারণ টিকিয়ে রাখার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি।

নামমাত্র অবৈতনিক’ ও আড়ালে থাকা সুযোগ ব্যয় (Opportunity Cost)

ইউনেস্কো যখন বাংলাদেশের অবৈতনিক শিক্ষার বছর গণনা করে, তখন তারা মূলত টিউশন ফি মওকুফ এবং বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণকে বিবেচনায় নেয়। তবে গবেষকদের মতে, এই শ্রেণীকরণটি পরিবারের প্রকৃত খরচকে আড়াল করে দেয়।

আইইআর-এর অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এই ব্যবধান সম্পর্কে বলেন, “কাগজে-কলমে বা সরকারিভাবে আমরা হয়তো এটাকে অবৈতনিক বলতে পারি, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। খাতা, কলম, যাতায়াত, প্রাইভেট কোচিং এবং খাবারের খরচ পরিবারগুলোকেই বহন করতে হয়। একটি নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য এই খরচ চালানো অসম্ভব।”

অধ্যাপক মজিবুর রহমান বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির আলোচনায় সচরাচর উপেক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ধারণা তুলে ধরেন, যা হলো সুযোগ ব্যয়’ (Opportunity Cost):

“একটি শিশু যদি স্কুলে না যেত, তবে হয়তো সে কোনো চায়ের দোকানে বা কৃষিকাজে শ্রম দিয়ে টাকা আয় করত। সেই হারিয়ে যাওয়া আয়টাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমি শিশুটিকে কাজে না পাঠিয়ে স্কুলে আসতে বাধ্য করছি, অথচ পরিবারের সেই আয়ের খুব প্রয়োজন ছিল।”

বর্তমানে দেশে যে উপবৃত্তি দেওয়া হয়, তা এই হারিয়ে যাওয়া আয়ের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে আইন করে বাধ্য করলেও তা ঝরে পড়ার হারই বাড়াবে, শিক্ষার প্রকৃত মান নয়।

শিক্ষক সংকট ও উচ্চশিক্ষায় তার প্রভাব

উভয় বিশেষজ্ঞই একমত যে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে মেয়াদের বছর বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। ড. মনিনুর রশিদ এই সমস্যাটিকে শিক্ষার ফলাফলের আলোকে ব্যাখ্যা করে বলেন, পঞ্চম শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী যদি দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির স্তরের পড়া না বোঝে, তবে তার শিক্ষার মেয়াদ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাড়িয়ে লাভ নেই। এটি কেবল ব্যবধানটিকে ওপরের স্তরে ঠেলে দেয়।

“ভিত্তি যদি শুরু থেকেই দুর্বল হয়, তবে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার প্রতিটি স্তরেই সেই দুর্বলতা বয়ে বেড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে প্রায় ৯০% আবেদনকারী ন্যূনতম যোগ্যতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন।” — ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ

মেধাবীদের শিক্ষকতায় অনীহা

অধ্যাপক মজিবুর রহমান শিক্ষক নিয়োগ ও তাদের এই পেশায় ধরে রাখার ক্ষেত্রে কাঠামোগত ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে বলেন, “বিসিএস পরীক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষকতা পেশা খুব কমই প্রথম পছন্দ হয়। দেশের সেরা মেধাবীরা কেন শিক্ষকতায় আসবেন না? কারণ আমরা তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা বা প্রণোদনা দিই না। অনেকেই ভাগ্যচক্রে অনিচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষক হন, ফলে কাজের প্রতি তাদের অনুপ্রেরণা থাকে না।”

স্মার্ট ডিভাইস বনাম মৌলিক অবকাঠামো: বাজেটের সঠিক ব্যবহার কোথায়?

সরকার বারবার শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের অঙ্গীকার করলেও, বরাদ্দের খাত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, “আমরা যদি বাজেট বাড়াইও, কিন্তু সেখানে যদি বিদ্যুৎ বা ওয়াই-ফাই না থাকে, তবে স্মার্ট ডিভাইস কিনে কী লাভ? আসল প্রশ্ন হলো, আমরা সঠিক জায়গায় টাকা খরচ করছি কি না।”

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও কঠিন কাজের তুলনায় দৃশ্যমান ও প্রযুক্তিনির্ভর মেগা প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রবণতাই বেশি দেখা যায় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণ টেনে ড. মনিনুর রশিদ বলেন, সেখানে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার পেছনে রয়েছে বিনামূল্যে বই-খাতা, কল্যাণমূলক ভাতা এবং পরিবারের জন্য রাষ্ট্রীয় আয় সহায়তা। অথচ বাংলাদেশে যে পরিবারের খাবার ও কর্মসংস্থান নেই, সেই পরিবারের একটি শিশু কেন শুধু বইয়ের জন্য স্কুলে আসবে

উত্তরণের পথ: প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত

ইউনেস্কোর এই র‍্যাংকিং নিজে থেকে বদলাবে না। অবৈতনিক শিক্ষার আইনি নিশ্চয়তা পঞ্চম শ্রেণি থেকে বাড়িয়ে অষ্টম শ্রেণি বা তার ওপরের স্তরে উন্নীত করার জন্য একটি কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অবৈতনিক শিক্ষায় এই অঞ্চলে তালিকার একদম তলানিতে অবস্থান করছে— এই সত্য নীতিনির্ধারকদের বহু বছর ধরেই জানা। ইউনেস্কোর তথ্য উপাত্ত এই ক্ষতটিকে আরও একবার বিশ্বমঞ্চে উন্মুক্ত করল। এখন দেখার বিষয়, সরকার এটিকে কেবল প্রশাসনিক দায়মুক্তির প্রকল্প হিসেবে দেখবে, নাকি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে একটি দীর্ঘমেয়াদি সফল রাষ্ট্র গঠনে এগিয়ে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *