
স্ক্রিনের সুখী জুটি, নেপথ্যে ২০ বছরের নিঃশব্দ দূরত্ব! যেভাবে ভেঙে গেল ‘লাইফস্প্রিং’ খ্যাত সুষমা-কুশালের ( Dr. Sushama and Dr. Kusal) ভালোবাসার রাজপ্রাসাদ!
বিশেষ ডেক্স প্রতিবেদন, ঢাকা:
শনিবার (২৭ জুন ২০২৬) ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯টা বেজে ৪ মিনিট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুট করেই যেন একটা বড়সড় ভূমিকম্প হয়ে গেল। স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠল একটি যৌথ ফেসবুক পোস্ট। কোনো ঝগড়া নয়, কোনো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি নয়— অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় এক মন খারাপ করা ঘোষণা। ঘোষণাটি দিলেন আর কেউ নন, নেটপাড়ার সবচেয়ে জনপ্রিয়, রুচিশীল এবং আদর্শ হিসেবে পরিচিত চিকিৎসক দম্পতি— ডা. সুষমা রেজা এবং ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশাল।
দীর্ঘ ২০ বছরের চেনা পথচলা, একসঙ্গে সংসার, সন্তান এবং হাজারো অমূল্য স্মৃতিকে এক নিমেষে পেছনে ফেলে তাঁরা ঘোষণা দিলেন— “আমরা আর একসঙ্গে নেই।”
Dr. Sushama and Dr. Kusal যাঁদের তৈরি ভিডিও দেখে প্রতিদিন হাজার হাজার দম্পতি নিজেদের ভাঙা সংসার জোড়া লাগাতেন, সেই ‘ম্যারেজ কাউন্সেলর’ জুটির নিজেদের সংসারই এভাবে ভেঙে যাবে, তা হয়তো কোনো অনুরাগী স্বপ্নেও ভাবেননি। ফলে এই ঘোষণা মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় এবং নেটিজেনদের মনে জন্ম দেয় অজস্র কৌতূহল ও প্রশ্ন। আসলে কী ঘটেছিল এই সুখী জুটির আড়ালে?
অল্প বয়সের প্রেম থেকে ‘লাইফস্প্রিং’— যেভাবে গড়ে উঠেছিল এক সাম্রাজ্য
Dr. Sushama পেশায় একজন প্রতিষ্ঠিত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং Dr. Kusal দেশের প্রথম সারির একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। খুব অল্প বয়সে একে অপরের প্রেমে পড়েছিলেন তাঁরা। হাত ধরেছিলেন এক দীর্ঘ রূপকথার জার্নি শুরু করার জন্য। দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় দুই দশক (২০ বছর)।
এই দীর্ঘ সময়ে তাঁরা শুধু একটি পরিবারই গড়েননি, একসঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মানসিক স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠান ‘লাইফস্প্রিং’। ফেসবুক ও ইউটিউবে দাম্পত্য জীবনের নানা অলিগলি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, রোমান্স টিকিয়ে রাখার উপায় এবং পরকীয়া বা দূরত্বের মতো জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে নিয়মিত কন্টেন্ট বানাতেন তাঁরা। লাখ লাখ মানুষের কাছে তাঁরা ছিলেন ‘আইডিয়াল কাপল’ বা আদর্শ দম্পতি।
Dr. Sushama and Dr. Kusal – “সোশ্যাল মিডিয়ার নিখুঁত ছবিটা আসল ছিল না”: ক্যামেরার পেছনের নির্মম সত্য
ফেসবুক পোস্টে এই দম্পতি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে স্বীকার করেছেন যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ তাঁদের যে সুখী রূপটি দেখত, তা কোনো কৃত্রিম অভিনয় ছিল না। তাঁরা একসাথে ভালো মুহূর্তগুলো সত্যিই উপভোগ করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে প্রতিটা মানুষ বদলায়, আর সেই নিয়মে বদলে গেছে তাঁদের সম্পর্কটাও।
তাঁরা লিখেছেন:
“সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা দুজনই উপলব্ধি করেছি, আমাদের সম্পর্ক সেই জায়গাটিতে নেই যেখান থেকে আমরা শুরু করেছিলাম। একটা সময় পরিবর্তনগুলো দেখে আমরা বুঝতে পেরেছি, জীবনের এই পর্যায়ে শান্তিপূর্ণভাবে আলাদা হয়ে যাওয়াই আমাদের দুজনের জন্য সবচেয়ে সম্মানজনক সিদ্ধান্ত।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পেশাগত জীবনে প্রতিনিয়ত অন্যদের সম্পর্কের বিষাক্ত বা নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ডিল করতে করতে এবং ‘লাইফস্প্রিং’-এর মতো বিশাল প্রতিষ্ঠানের চাপ সামলাতে গিয়ে এই দম্পতি নিজেদের অজান্তেই একে অপরের থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। অন্যের ঘর বাঁধতে বাঁধতে নিজেদের ঘরের সুতোটা কখন আলগা হয়ে গেছে, তা হয়তো তাঁরা নিজেরাও টের পাননি।
Dr. Sushama and Dr. Kusal – “জীবন খুবই ভঙ্গুর”: শেষ বার্তায় লুকিয়ে কোন অনুশোচনা?
এই বিচ্ছেদের খবরের সবচেয়ে চটকদার ও আবেগঘন অংশটি ছিল পোস্টের একদম শেষের লাইনে। বিদায়বেলায় ভক্তদের উদ্দেশ্যে এই চিকিৎসক দম্পতি নিজেদের জীবন থেকে শেখা একটি চরম সত্য ও অনুশোচনার কথা লিখে গেছেন।
তাঁরা লিখেছেন:
“নিজের পরিবারকে সময় দিন। প্রিয় মানুষগুলোর হাত শক্ত করে ধরে রাখুন। জীবন খুবই ভঙ্গুর। আজকের একেবারে সাধারণ, নীরব মুহূর্তগুলোই কখন যে আগামী দিনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতিতে পরিণত হয়, আমরা অনেক সময় তা বুঝতেই পারি না। তাই প্রতিটি মুহূর্ত বাঁচুন সচেতনভাবে, কৃতজ্ঞতায় এবং আন্তরিকতায়।”
এই একটি লাইনই বলে দেয়, ক্যারিয়ার, লাইক-কমেন্ট-শেয়ার আর পেশাগত সাফল্যের ইঁদুরদৌড়ে কোথাও না কোথাও তাঁরা নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত সময়গুলোকে হারিয়ে ফেলেছিলেন। সাধারণ, নীরব মুহূর্তগুলোর অভাবই আজ তাঁদের ২০ বছরের সাজানো সংসারকে এক লহমায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিল।
“আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ, দয়া করে ভাইরাল ট্রল বানাবেন না”
বিচ্ছেদের খবর ছড়াতেই যখন ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে নানারকম গুজব ও মিম তৈরি হতে শুরু করেছে, তখনই নেটিজেনদের বিবেককে নাড়া দিয়ে একটি সংবেদনশীল অনুরোধ করেছেন সুষমা-কুশাল।
তাঁরা বিনীতভাবে জানিয়েছেন, স্ক্রিনের ওপারে থাকা মানুষগুলো স্রেফ কোনো নিউজ বা ভাইরাল কন্টেন্ট নয়, তাঁরাও রক্ত-মাংসের মানুষ। এই কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে তাঁদের নিজেদেরই দীর্ঘ আত্মসমালোচনা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে তাঁদের সন্তান, বয়োবৃদ্ধ মা-বাবা এবং ভাইবোনদের যেন এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোংরা বিচার-বিশ্লেষণ ও গুজবের মুখোমুখি হতে না হয়, সেজন্য তাঁরা হাত জোড় করে সংযম ও সহমর্মিতা প্রার্থনা করেছেন।
এক বিষাদময় অধ্যায়ের সমাপ্তি
কোনো কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি নেই, কোনো পরকীয়া বা প্রতারণার সস্তা অভিযোগ নেই; অত্যন্ত শান্ত গ্রহণযোগ্যতা আর পরস্পরের প্রতি সম্মান রেখেই বিচ্ছেদের পথে হেঁটেছেন এই চিকিৎসক দম্পতি। তবে তাঁদের এই বিদায় নেটদুনিয়ার সাধারণ মানুষদের মনে একটি চিরন্তন সত্যকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করে গেল— ভার্চুয়াল লাইফের “পারফেক্ট কাপল” বা নিখুঁত সুখী দম্পতি বলে বাস্তবে আসলে কিছুই হয় না; সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে একে অপরকে সময় দিতে হয়।
আরো পড়ুনঃ “বাস্তব না সিনেমার গল্প? একসঙ্গে জন্ম, একই স্কুল, আর মাধ্যমিকেও হুবহু এক নম্বর!”





