প্রধান শিক্ষকের ‘পরকীয়ায়’ তছনছ সংসার, প্রকাশ্যেই প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে পেটালেন সহকারী শিক্ষক সিসিটিভি ফুটেজ ঘিরে তোলপাড়

প্রধান শিক্ষকের ‘পরকীয়ায়’
প্রধান শিক্ষকের ‘পরকীয়ায়’

The Tragic Chapter: যখন শিক্ষকের ‘Extramarital Affair’ রূপ নেয় Open Conflict-এ; সিসিটিভি ফুটেজ ঘিরে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক | শরীয়তপুর

প্রকাশিত: ০৫ জুলাই ২০২৬

শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার ৮৭ নম্বর আব্বাস আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষার আলো ছড়ানোর এই পবিত্র আঙিনায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পুরো দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে মারধর করছেন তারই এক সহকারী শিক্ষক।

প্রাথমিক দৃষ্টিতে এটি কেবল একটি ছুটির আবেদন কেন্দ্রিক সংঘাত মনে হলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক দীর্ঘ, যন্ত্রণাদায়ক ও জটিল মনস্তাত্ত্বিক গল্প। এই ঘটনার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে সংসার ভাঙার অভিযোগ, চরম দারিদ্র্য, ‘পরকীয়া’র দাবি এবং ব্ল্যাকমেইল ও আধুনিক প্রযুক্তির (এআই) অপব্যবহারের মতো চাঞ্চল্যকর বিষয়।

গত বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই) সকালে বিদ্যালয়ের পরিবেশ ছিল কিছুটা থমথমে। সেদিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদ্যালয় পরিদর্শনের কথা ছিল এবং বিকেলে নির্ধারিত ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা।

সকাল ৯টার দিকে প্রধান শিক্ষক মো. আলী আসাদ মিয়া ডিজিটাল হাজিরা শেষ করে সব শিক্ষককে ক্লাসে যাওয়ার নির্দেশ দেন। ঠিক এমন সময় সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন একটি নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন নিয়ে তার কাছে আসেন। পূর্বানুমতি না থাকা এবং পরিদর্শনের ব্যস্ততার কারণে প্রধান শিক্ষক ছুটি নামঞ্জুর করেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জানা যায়, ছুটি না পাওয়ায় সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। শুরু হয় বাগবিতণ্ডা। একপর্যায়ে প্রধান শিক্ষক কক্ষ থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে দেলোয়ার হোসেন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি প্রধান শিক্ষকের কলার চেপে ধরে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকেন এবং গলা চেপে ধরেন। পরে বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক ও দপ্তরি-কাম-প্রহরী ছুটে এসে প্রধান শিক্ষককে উদ্ধার করেন।

এই আকস্মিক হামলার পেছনের কারণ জানতে চাইলে সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন এক হৃদয়বিদারক অভিযোগ তুলে ধরেন। তার দাবি,

এই ক্ষোভ একদিনের নয়; গত ২০ মাস ধরে তিনি চরম মানসিক নিপীড়নের শিকার।

মারামারির দিন সকালে দেলোয়ার কেন এত মরিয়া হয়ে ছুটি চেয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে জানান এক চরম অসহায়ত্বের কথা। তিনি জানান, টানা দুদিন ধরে তার বাসায় রান্না করার মতো গ্যাস ছিল না এবং গ্যাস কেনার টাকাও তার কাছে ছিল না। আগের রাতে মসজিদ থেকে আনা খিচুড়ি তিনি সন্তানদের খাইয়েছিলেন। সেই বাসি খাবার খেয়ে সকালে তার এক সন্তান মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়ে। সন্তানকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার জন্যই তিনি ছুটির আবেদন করেছিলেন।

“প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে আমার গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে বিরোধ চলছে। তিনি আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়েছেন। তার কারণে আমার সংসার দুবার ভেঙেছে। তিনি আমার স্ত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করে আমার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করিয়েছেন। মামলা চালাতে গিয়ে আমি ১০-১২ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।” — ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন সহকারী শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক তাকে ফাঁসানোর জন্য বিভিন্ন দপ্তরে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছেন এবং ছুটি না দেওয়ার পেছনে প্রধান শিক্ষকের ভয় ছিল যে তিনি হয়তো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ নিয়ে যাবেন।

সহকারী শিক্ষকের এসব গুরুতর অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক মো. আলী আসাদ মিয়া। তিনি নিজেকে এই ঘটনার ‘নিরপরাধ ভুক্তভোগী’ হিসেবে দাবি করে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন।

প্রধান শিক্ষকের দাবি, দেলোয়ার এবং তার স্ত্রীর মধ্যে গত ১০ বছর ধরেই দাম্পত্য কলহ চলছিল এবং তারা বিচ্ছেদের পর্যায়েও গিয়েছিলেন। সহকর্মীদের অনুরোধে তিনি কেবল তাদের মধ্যে সমঝোতা করার চেষ্টা করেছিলেন মাত্র।

প্রধান শিক্ষক এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, দেলোয়ার হোসেন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে ফাঁসানোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করেছেন।

“তিনি আমার মোবাইল চুরি করে এবং তার স্ত্রীর মোবাইলের কিছু তথ্য ব্যবহার করে ইমো (Imo) চ্যাট ও কল রেকর্ড সম্পাদনা করেছেন। এমনকি এআই (Artificial Intelligence) ব্যবহার করে ভুয়া প্রমাণ তৈরি করা হয়েছে। ইমোতে সাধারণত নাম দেখা যায়, কিন্তু তিনি এডিট করে আমার নম্বর বসিয়েছেন। এসব দেখিয়ে তারা আমার কাছে টাকা দাবি করে ব্ল্যাকমেইল করেছেন।” — দাবি করেন প্রধান শিক্ষক আলী আসাদ।

তিনি আরও জানান, দেলোয়ার হোসেন নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতেন না এবং অনিয়ম করতেন। এসব কারণে তাকে এর আগে অন্য বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছিল। সেখানেও নারীঘটিত কেলেঙ্কারিতে জড়ানোর পর তাকে পুনরায় এই বিদ্যালয়ে ফেরত পাঠানো হয়।

বিষয়সহকারী শিক্ষক (দেলোয়ার হোসেন)-এর দাবিপ্রধান শিক্ষক (আলী আসাদ মিয়া)-এর দাবি
মূল অভিযোগপ্রধান শিক্ষক তার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িত।পরকীয়ার অভিযোগ মিথ্যা; তাদের ১০ বছরের দাম্পত্য কলহ রয়েছে।
ছুটি না দেওয়াসন্তান অসুস্থ থাকায় ছুটি চেয়েছেন, কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেওয়া হয়নি।পরিদর্শন ও সভার কারণে তাৎক্ষণিক ছুটি দেওয়া সম্ভব ছিল না।
তথ্য-প্রমাণঅডিও রেকর্ড ও চ্যাটের স্ক্রিনশট রয়েছে।এসব প্রমাণ এআই (AI) ও সফটওয়্যার দিয়ে এডিট করা এবং ভুয়া।
পেশাগত আচরণপারিবারিক যন্ত্রণায় তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত।তিনি নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দেন এবং পূর্বেও নারী কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন।

বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা এবং পাল্টাপাল্টি গুরুতর অভিযোগের বিষয়টি শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলে পৌঁছেছে।

  • Action from Administration: ঘটনার পরপরই প্রধান শিক্ষক উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ইউএনও-র কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পাশাপাশি থানায়ও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
  • বিভাগীয় ব্যবস্থা: ইতিমধ্যে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধেও একটি বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাকে শোকজ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে বেদরগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রিপন মিঞা জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে জেলা শিক্ষা অফিস তদন্ত করছে। পরকীয়া ও অনৈতিক সম্পর্কের মতো স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে মানিকগঞ্জ থেকে বিশেষ কর্মকর্তা এসে তদন্ত পরিচালনা করবেন।

শরীয়তপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহ মো. ইকবাল মনসুর বলেন,

“ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর আমরা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে যাচ্ছি। প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও তদন্তাধীন। তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে এবং দোষী প্রমাণিত হলে যে কারও বিরুদ্ধেই কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পুরো দেশ এখন তাকিয়ে আছে শিক্ষা বিভাগের এই সুষ্ঠু তদন্তের দিকে। শিক্ষার পবিত্র আঙিনায় ঘটে যাওয়া এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রকৃত সত্য দ্রুতই বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রধান শিক্ষকের ‘পরকীয়ায়’ তছনছ সংসার, প্রকাশ্যেই প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে পেটালেন সহকারী শিক্ষক সিসিটিভি ফুটেজ ঘিরে তোলপাড়

Share the Post:

Related Posts