
৫৩ হাজার ফেল চট্টগ্রামে, ‘শিট মুখস্থ’ যেখানে থেমে গেল…
চট্টগ্রামের এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষা পাসের হারে এই বড় ধসের নেপথ্যে রয়েছে কাঠামোগত পরিবর্তন।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে মাধ্যমিক/উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে নেমে এসেছে সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এবার বোর্ডে মোট ১ লাখ ৩০ হাজার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও অকৃতকার্য বা ফেল করেছে ৫৩ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। ফলে গত বছরের তুলনায় পাসের হার একধাক্কায় ৭২ শতাংশ থেকে নেমে এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫৯ শতাংশে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করার নেপথ্যে প্রধান দায় ইংরেজি ও গণিত বিষয়ের কোচিংয়ের শিট মুখস্থ । ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র ইংরেজিতেই ফেল করেছে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী এবং গণিতে অকৃতকার্য হয়েছে ২৫ হাজার। বিশাল এই বিপর্যয় চট্টগ্রামজুড়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা সচেতন মহলে বড় ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
কিন্তু কেন এই অভূতপূর্ব পাসের হার পতন? ফলাফলের বিশদ বিশ্লেষণে দুটি মূল কারণ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে:
১. প্রশ্নের কাঠামোগত পরিবর্তন ও শিখনফলভিত্তিক প্রশ্ন
এতদিন ধরে ঐতিহ্যগতভাবে যে ধরনের মুখস্থ প্রশ্ন আসত, এবার পরীক্ষা পদ্ধতিতে ছিল তার সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য। অন্ধের মতো মুখস্থ করা তথ্যের বদলে এবার প্যাসেজ পড়ে মূল ভাব অনুধাবন করা, প্রসঙ্গ অনুযায়ী কঠিন শব্দের অর্থ নির্ণয় করা এবং মুখস্থ না করে নিজের ভাষায় পুরো বিষয়টি গুছিয়ে ব্যাখ্যা করার দক্ষতা যাচাই করা হয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী সৃজনশীল চিন্তা বা বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত অর্থ না বুঝে কেবল বাঁধাধরা নোট মুখস্থ করেছিল, তারা পরীক্ষার হলে গিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে।
২. নিরপেক্ষ খাতা মূল্যায়নে ‘রুব্রিক্স’ (Rubrics) পদ্ধতি
খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বোর্ডের চালু করা ‘রুব্রিক্স’ পদ্ধতিও এই ফল বিপর্যয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। অতীতে শিক্ষকরা খাতা মূল্যায়নের সময় ঢালাওভাবে বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নম্বর দিতেন, কিংবা কিছুটা কাছাকাছি লিখলেই দয়াপরবেশ হয়ে পাস নম্বর দিয়ে দিতেন। তবে ‘রুব্রিক্স’ পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরের মান নির্দিষ্ট কিছু সূচক (যেমন: ব্যাকরণগত নির্ভুলতা, উত্তর প্রাসঙ্গিক হওয়া, মূল ভাব ধরে রাখা ইত্যাদি) দিয়ে স্পষ্টভাবে মেপে নম্বর দেওয়া হয়। ফলে কৌশলগত কারণে দুর্বল উত্তরের ওপর ভর করে পাস করে যাওয়ার সুযোগ এবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং এতে ছাড় পাননি কাউকেই।
কোচিংয়ের শিট মুখস্থ যখন কাল হলো
এই ফলাফল নিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সরাসরি প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে জানান, বিপর্যয়ের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সেই শিক্ষার্থীরাই, যারা বছরের পর বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সিনিয়র শিক্ষার্থীদের বানানো তথাকথিত কোচিং সেন্টারের ‘হ্যান্ডনোট’ বা ‘শিট’ মুখস্থ করার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রামের অলিগলিতে গড়ে ওঠা নামসর্বস্ব কোচিং সেন্টারগুলো শিক্ষার্থীদের বই পড়ে বিষয়বস্তু বোঝার চেয়ে সংক্ষিপ্ত ‘শিট’ উপহার দিয়ে শর্টকাট উপায়ে পাস করানোর ফাঁদে ফেলে আসছিল। বিগত বছরগুলোতে এই বাঁধাধরা শিট কিংবা সাজেশন মুখস্থ করেই এক শ্রেণির শিক্ষার্থী বৈতরণী পার হয়ে যেলেও, এবার প্রশ্নের কাঠামো পরিবর্তন হওয়ার পর সেই পুরনো শিটই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জন্য।
ইংরেজি ও গণিতে ধসের প্রকৃত কারণ
পরীক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে ইংরেজি ও গণিত। বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে শিক্ষকরা জানাচ্ছেন:
- ইংরেজি: বেশিরভাগ শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের মূল প্যাসেজ না পড়ে কেবল বিগত বছরের গাদা গাদা মডেল টেস্ট এবং শিট মুখস্থ করে যেত। নতুন নিয়মে পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখা গেছে, প্যাসেজের ওপর নিজস্ব বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা না থাকায় তারা প্রশ্নের উত্তর নিজের ভাষায় গুছিয়ে লিখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
- গণিত: গাণিতিক সূত্র ও ধাপগুলো না বুঝে সরাসরি অঙ্ক মুখস্থ করার ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে এখানে। প্রশ্নের সূক্ষ্ম পরিবর্তন বা ঘুরিয়ে দেওয়া সমস্যা সমাধান করতে না পারায় ২৫ হাজার পরীক্ষার্থী গণিতে আটকে গেছে।
আরো পড়ুন- প্রাইম মিনিস্টার্স গোল্ডকাপ: ছাত্র না পেলে টিচাররা (শিক্ষকরা) খেলবে, কিন্তু টিম গঠন করতে হবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও অভিভাবকদের মতামত
চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের মতে, এই ধাক্কাটি মূলত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি প্রয়োজনীয় ‘আই ওপেনার’ বা চোখ খুলে দেওয়ার মতো ঘটনা। শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের শিট ও গাইড নির্ভরতার যে ক্যানসার তৈরি হয়েছিল, তা এক রাতে দূর করা সম্ভব নয়। এতদিন ধরে জিপিএ-৫ পাওয়ার যে ভুয়া দৌড় চলছিল, বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হওয়ায় মূল সত্যটি এখন সামনে এসেছে।
তবে অভিভাবকরাও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, হঠাৎ করে পরীক্ষার প্রশ্নপদ্ধতি এবং খাতা মূল্যায়নে এতো কঠোর পরিবর্তন আনা হলেও শ্রেণীকক্ষে তার পূর্বপ্রস্তুতি কতটা ছিল? শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়ে বা শ্রেণীকক্ষে বিশ্লেষণাত্মক পড়াশোনা না করিয়ে হঠাৎ জটিল মূল্যায়নে যাওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম বলির পাঁঠা হয়েছে।
আগামীর শিক্ষা কোন পথে?
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এই ফল একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— মুখস্থবিদ্যা ও শর্টকাট সাজেশনের দিন শেষ। পরীক্ষায় ভালো করার জন্য শিক্ষার্থীদের এখন থেকেই পাঠ্যবইয়ের মূল বিষয়বস্তু গভীরভাবে বুঝতে হবে, রিডিং পড়ার অভ্যাস বাড়াতে হবে এবং নিজের ভাষায় লেখার দক্ষতা অর্জন করতে হবে। সেই সাথে শিক্ষক ও কোচিং সেন্টারগুলোকেও তাদের পুরানো ধারার পাঠদান পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাদানে মনোযোগ দিতে হবে, তা না হলে আগামী দিনগুলোতে এই ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হবে না।





